প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির কারণে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে দেশটির পুঁজিবাজারে। বিশেষত অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কায় তারা শেয়ার বিক্রি বাড়িয়ে দিয়েছেন। ফলে গত মাসে শীর্ষ অবস্থান থেকে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের মূল্য ৪ ট্রিলিয়ন বা ৪ লাখ কোটি ডলার কমে গেছে। অথচ নির্বাচনে জেতার পর ট্রাম্পের অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি নিয়ে আশাবাদী ছিলেন বিনিয়োগকারীরা। খবর রয়টার্স।
হোয়াইট হাউজে প্রবেশের আগে থেকেই শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়ে আসছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ নিয়ে বিশ্লেষকদের আশঙ্কাকে সত্য প্রমাণ করে তার নীতিগুলো ব্যবসা, ভোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের মাঝে অনিশ্চয়তার আশঙ্কা বাড়িয়েছে। বিশেষ করে কানাডা, মেক্সিকো ও চীনের মতো বড় বাণিজ্য অংশীদারদের বিরুদ্ধে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পারস্পরিক শুল্ক আরোপ পরিস্থিতি খারাপের দিকে নিয়ে গেছে।
এ বিষয়ে পরামর্শক সংস্থা ওয়েলথ অ্যানহ্যান্সমেন্টের বিনিয়োগবিষয়ক জ্যেষ্ঠ কৌশলবিদ আয়াকো ইয়োশিওকা বলেন, ‘বিনিয়োগ মনোভাবে স্পষ্টতই বড় ধরনের পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি। আগে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে ধরনের প্রবণতা বা কৌশল কাজ করেছে, এখন তার অনেক কিছুই কাজ করছে না।’
পুঁজিবাজারের ধারাবাহিক এ পতন গত সোমবার আরো গভীর হয়েছে। এদিন ২ দশমিক ৭ শতাংশ দর হারিয়েছে প্রধান সূচক এসঅ্যান্ডপি ৫০০, যা দৈনিক হিসেবে চলতি বছরের সবচেয়ে বড় পতন। ৪ শতাংশ পতন ঘটে নাসডাক কম্পোজিটের, যা ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের পর সবচেয়ে বড় দৈনিক পতন।
গত ১৯ ফেব্রুয়ারির রেকর্ড উচ্চতা থেকে সোমবার এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ৮ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে, বাজারমূল্যে এ ক্ষতির পরিমাণ ৪ লাখ কোটি ডলারের বেশি। প্রায় ১০ শতাংশ পতন সূচকের জন্য সতর্কবার্তা দিচ্ছে। অন্যদিকে নাসডাক ডিসেম্বরে পৌঁছানো শীর্ষ অবস্থানের তুলনায় ১০ শতাংশ নিচে নেমেছে।
গত শনিবার সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মন্দা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এ নিয়ে কোনো পূর্বাভাস দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তিনি। মূলত তার বাণিজ্যনীতি উদ্ভূত উদ্বেগ থেকে এ প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে বিনিয়োগ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের লেজার্ডের সিইও পিটার ওর্সজাগের সাম্প্রতিক মন্তব্য উল্লেখ করা যায়। তিনি বলেন, ‘কানাডা, মেক্সিকো ও ইউরোপের সঙ্গে শুল্ক যুদ্ধ শুরু হওয়ায় বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এটি বিভিন্ন কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ নির্বাহীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘চীনের সঙ্গে উত্তেজনা থাকা স্বাভাবিক মনে হলেও কানাডা, মেক্সিকো ও ইউরোপের বিষয়টি বিভ্রান্তিকর। যদি আগামী এক-দুই মাসের মধ্যে এর সমাধান না হয়, তাহলে এটি মার্কিন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ (এমঅ্যান্ডএ) কার্যক্রমে ক্ষতি করতে পারে।’
গত সোমবার মার্কিন এভিয়েশন খাতের অন্যতম কোম্পানি ডেল্টা এয়ারলাইনসের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) মুনাফার পূর্বাভাস অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে, ফলে আফটারমার্কেট ট্রেডিংয়ে কোম্পানির শেয়ারদর ১৪ শতাংশ পড়ে যায়। কোম্পানির সিইও এড বাস্তিয়ান এর জন্য মার্কিন অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাকে দায়ী করেছেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন বিনিয়োগকারীরা দুটি বিষয়ের দিকে নজর রাখছেন। একটি হলো আংশিক শাটডাউন রোধকল্পে ফান্ডিং বিল পাস, কংগ্রেস বিলটি পাস করতে ব্যর্থ হলে কিছু সরকারি দপ্তর ও পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যটি আজ প্রকাশ হতে যাওয়া মূল্যস্ফীতিসংক্রান্ত প্রতিবেদন।
অবশ্য বাজারের এ পতনকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন পরামর্শক সংস্থা বায়ার্ডের বিনিয়োগ কৌশলবিদ রস মেফিল্ড। তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছে বাজারের পতনকে ট্রাম্প প্রশাসন কিছুটা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করছে। যদি বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে, তারা সম্ভবত মন্দাকেও মেনে নিতে রাজি থাকবে। আমি মনে করি, এটি ওয়াল স্ট্রিটের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা।’
পরিসংখ্যান অনুসারে, সাম্প্রতিক পুঁজিবাজারে আগের কিছু প্রবণতা কাজ করছে না। যেমন ২০২৩ ও ২০২৪ সালে টানা ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও চলতি বছরের শুরু থেকে এনভিডিয়া ও টেসলারের মতো প্রযুক্তি খাতের বড় কোম্পানিগুলো দুর্বল পারফর্ম করেছে, যা প্রধান সূচকগুলোর পতন ডেকে এনেছে। সোমবার এসঅ্যান্ডপি প্রযুক্তি খাতের সূচক ৪ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে, যেখানে অ্যাপল ও এনভিডিয়ার প্রায় ৫ শতাংশ পতন হয়েছে। অন্যদিকে ১৫ শতাংশ পতনে প্রায় ১২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার বাজার মূলধন হারিয়েছে টেসলা। একই সময় অন্য ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, যেমন বিটকয়েনের মূল্য ৫ শতাংশ কমে গেছে। তবে বাজার পতনের সময় স্থিতিশীল থাকে এমন খাত তুলনামূলকভাবে ভালো পারফর্ম করেছে। যেমন পরিষেবা খাতের সূচক ১ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত সরকারি বন্ডের চাহিদা বেড়েছে।
৫ নভেম্বরের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প জেতার পর এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকে ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়। তখন বিনিয়োগকারীরা আশাবাদী ছিলেন, ট্রাম্পের কর হ্রাস ও শিথিল নিয়ন্ত্রণের এজেন্ডা বাজারের জন্য উপকারী হবে। কিন্তু সূচকটি ওই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩ শতাংশ কমেছে। হেজ ফান্ডগুলো দুই বছরের মধ্যে শেয়ারবাজারের হিস্যা সবচেয়ে কমিয়ে আনে বলে গত শুক্রবার তথ্য দিয়েছে গোল্ডম্যান স্যাকস।